ইউরোপে প্রথমবার – পর্ব এক
ছোটবেলা থেকেই ইউরোপের প্রতি আমার এক বিশেষ আকর্ষণ ছিলো। ইউরোপ সম্পর্কে তখন যতটুকু জেনেছি সবই টেলিভিশন, সিনেমা, বইপত্র, পরিচিত প্রবাসী মানুষজন ইত্যাদি মাধ্যম থেকে। অন্যান্য দেশ-মহাদেশের সম্পর্কে জানার পরেও, ইউরোপ বেশি ভালো লাগত হয়তো একরকম বৈপরীত্য থেকে। বাংলাদেশ জনবহুল গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। অন্যদিকে ইউরোপ তুলনামূলক কম জনসংখ্যার শীতপ্রধান দেশে ভরপূর। মানুষ ভিন্নতা পছন্দ করে। তাই আমার মধ্যেও নিজ জগৎ থেকে এক ভিন্ন জগৎ ইউরোপকে দেখার একটা ইচ্ছা সৃষ্টি হয়। গুগল ম্যাপ বের হওয়ার অনেক আগে, আমি দীর্ঘ সময় এটলাস নামক মানচিত্রর একটা বই নিয়ে বসে থাকতাম। অধিকাংশ সময়ে ইউরোপের দেশ গুলোকে খুব গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম। নিজের কল্পনায় ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়াতাম। মুভি, খবর ইত্যাদিতে ইউরোপের দৃশ্য গুলো থেকে বোঝার চেষ্টা করতাম ইউরোপ কেমন হতে পারে। গল্পের বইতে থাকা ইউরোপের দৃশ্যর বর্ণনা গুলোতে নিজেকে কল্পনা করতাম। এভাবেই ধীরে ধীরে ইউরোপ ভ্রমন আমার বাকেট লিস্টের এক নাম্বারে চলে আসে।
কোভিডের ঠিক পরপর আমার স্ত্রীর সাথে ভ্রমন সংক্রান্ত গল্প করছিলাম। আমরা চিন্তা করে দেখলাম গত প্রায় দুই বছর হয়ে গেলো যে আমরা ঘটা করে কোথাও ঘুরতে যাইনি। আমরা ঠিক করলাম একটা শীতের দেশে যাওয়া যেতে পারে। প্রথমে ভাবলাম নিউজিল্যান্ডে যাই। কিছুদিন ঘাটাঘাটি করে দেখলাম নিউজিল্যান্ড তখনও কোভিডের পর পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। আমাদের মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। আবার খোজা শুরু করলাম কোথায় যাওয়া যায়। আমরা খুঁজছিলাম শান্তিপূর্ণ, শীতপ্রধান, এশিয়ার বাইরে, প্রাকিতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ কোন দেশ। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, এই ক্রাইটেরিয়াতে আরেকটি দেশ আছে; তা হচ্ছে সুইজারল্যান্ড। আমাদের প্ল্যান চেঞ্জ হয়ে গেল নিউজিল্যান্ড থেকে সুইজারল্যান্ডে। আমরা সল্পসময়ে হোটেল, ফ্লাইট সব বুক করে ভিসা এপ্লাই করে ফেললাম। দীর্ঘ দিনের কল্পনার পর আমার প্রথমবার ইউরোপ ভ্রমণ বাস্তবে রূপ নেয়া শুরু করলো।
কোভিডের পর কোনো এক জুলাই মাসের মাঝামাঝি রাত দুটায় আমাদের ফ্লাইট। সিঙ্গাপুর থেকে কাতার এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে প্রথমে যাবো দোহা হামাদ এয়ারপোর্টে। প্রায় আট ঘণ্টার একটি যাত্রা। আমি পুরোপুরি ঘুমাতে পারলাম না। এক রকম তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে ঝিমাতে ঝিমাতে যখন দোহাতে প্লেন ল্যান্ড করল, তখন বাজে প্রায় ভোর পাঁচটা। প্লেন থেকে নেমে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলাম। পরের ফ্লাইট আরও আড়াই ঘণ্টা পর। সময় কাটানোর জন্য ভাবলাম এয়ারপোর্টটা একটু ঘুরে দেখা যাক। হামাদ এয়ারপোর্টে পাঁচটি টার্মিনাল। তিনটি টার্মিনাল এক পাশে আর ওপর দুটি অন্য আরেক প্রান্তে। দুই প্রান্তে যাওয়া আসা করার জন্য একটা ট্রেন আছে। মজার ব্যপার হচ্ছে এই ট্রেনটি মাত্র এক কিলোরও কম রাস্তা যাওয়া আসা করে। প্রতিটা টার্মিনাল যেন একটা শপিং মল। অসংখ্য দোকানে ভরপুর। আমরা ঘুরতে ঘুরতে একটা খাবার দোকানে নাশতা সেরে নিলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখতে চাই। এই লেখাটি টাইপ করা পর্যন্ত আমার খাওয়া সেরা পাউরুটি হামাদ এয়ারপোর্টে পাওয়া যায় হাহা। নাশতা পর্ব শেষে আরও কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করতে করতে ফ্লাইটের সময় হয়ে গেলো। প্লেন উঠে বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের জানানো হলো প্লেন কোনো যান্ত্রিক সমস্যা আছে। আমরা আবার প্লেন থেকে নেমে গেলাম। কিছুক্ষন পর পর গেটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আর কতক্ষণ লাগতে পারে। এমন করতে করতে আরও পাঁচ ঘণ্টা পর আমাদের বলা হলো আমরা এখন আবার প্লেন উঠতে পারি। প্লেন উঠে অনুভব করলাম আমরা ভয়ানক রকম ক্লান্ত। আট ঘণ্টার প্রথম ফ্লাইট আর সাত ঘণ্টার লে ওভারে মোট পনেরো ঘণ্টা ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। দোহা থেকে এখনকার ফ্লাইট আরও ছয় ঘণ্টা। গন্তব্য সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে। অনেক ক্লান্ত থাকার পরেও মনে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছিলো। জীবনের প্রথমবারের মতো ইউরোপে পা রাখার উত্তেজনা। দেখতে দেখতে ছয় ঘণ্টা কেটে গেলো। সুইজারল্যান্ড সময় প্রায় বিকাল পাঁচটায় আমরা জুরিখে ল্যান্ড করলাম।
জুরিখ এয়ারপোর্ট একটা সাধারণ অভ্যন্তরীণ এয়ারপোর্টের মতো। কাতারের হামাদ অথবা সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্টের মতো প্রাচুর্য এখানে নেই। ঘন্টা খানেকের মধ্যে ইমিগ্রেশন শেষ করে আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আসলাম। এয়ারপোর্টের বাইরেই একটা বড় ট্রেন স্টেশন। আমরা স্টেশনের ইনফরমেশনে গেলাম আমাদের গন্তব্যে কোন ট্রেনে যাওয়া যায় সেটা জানার জন্য। স্টেশনের একজন কর্মকর্তা আমাদের একটা ম্যাপ দিলেন। আর বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে আমাদের হোটেলে যাওয়া যাবে। আমরা তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটা ধরলাম। প্ল্যাটফর্মের গিয়ে দেখি খুব ঝকঝকে তকতকে ট্রেন আসা যাওয়া করছে। কোন কোন বগি একতলা কোনোটা আবার দোতলা। আমরা আমাদের প্লাটফর্ম খুঁজে বের করে একটা ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনের ভেতরে অনেক পরিচ্ছন্ন। বেশ আরাম দায়ক সিট। তেমন ভিড়ভাট্টা নেই। প্রায় মিনিটি বিশেক যাত্রার পর আমরা আমাদের কাঙ্খিত স্টেশনে নামার আগে খেয়াল করলাম আমরা ইতিমধ্যে যেখানে নামব তা পার হয়ে চলে এসেছি। পরের স্টপ নেমে আবার উল্টো দিক থেকে ট্রেনে করে কাঙ্খিত স্টপে গেলাম। ট্রেন থেকে নেমে আমাদের লাগেজ গুলো নিয়ে প্রথম বারের মতো খোলা আকাশের নিচে আসলাম। এ যেন এক অসাধারণ অনুভূতি। মনে পরে গেল সেই এটলাস মানচিত্রের বইয়ের কথা। মনে পরে গেল শত কল্পনার কথা। সকল কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, মহান আল্লাহর অসীম দয়ায়, আমি দাড়িয়ে আছি ইউরোপের অন্যতম সুন্দর শহরে।
চলবে।