saadixl

ইউরোপে প্রথমবার – পর্ব দুই

যে সময়ে আমরা সুইজারল্যান্ড গিয়েছি, তখন ইতিমধ্যে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে ফেলেছে। জুরিখে খোলা আকাশের নিচে প্রথমবারের মতো দাড়িয়ে আমি হঠাৎ একটা ব্যপার দেখে একটু ভয় পেয়ে গেলাম। দেখি আকাশে রকেট চলার মতো একাধিক ধোয়ার রেখা দেখা যাচ্ছে। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম ব্যাপার কি? তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি লেগে গেল? কিন্তু আসে পাশে মানুষ দেখলাম খুব ভাবলেশহীন। কিছুক্ষন পর ব্যাপারটা বুঝলাম। এয়ার পলিউশন না থাকার কারণে ক্রুইজিং অলটিটিউডে চলতে থাকা বিমানও খালি চোখে দেখা যাচ্ছে। কিছুটা নিশ্চিত হয়ে হেঁটে হেঁটে রওনা দিলাম হোটেলের পথে। হাঁটছিলাম আর দেখছিলাম জুরিখের রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর, দোকান-পাট কেমন। অধিকাংশ ভবন চার থেকে পাঁচ তলার মতো। রাস্তায় খুব কম মানুষজন। কেমন যেন এক অদ্ভুত নীরবতা ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম ছোট বেলায় টিভিতে ইউরোপের শহর গুলো ঠিক এমনই দেখাতো। আসলে আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো চারিদিক দেখছিলাম। আমরা যখন হোটেলে পৌঁছলাম তখন কেবল সূর্য ডুবেছে। কিন্তু ঘড়িতে সময় রাত সাড়ে নয়টা। গ্রীষ্মকাল তাই অত্যাধিক বড় দিন। কিন্তু দীর্ঘ সময় আলো থাকা ব্যাপারটা আমার মতো পর্যটকের জন্য ভালো। সন্ধ্যা দশটার দিকে হোটেলে চেকইন করে রুমে চলে গেলাম। দীর্ঘ ছাব্বিশ ঘণ্টা জার্নি শেষে আমার বাসা থেকে জুরিখের হোটেল রুমে পৌঁছে গেলাম। শেষ কথাটা কিছুটা মজার ছলেই বললাম। যেন এক রুম থেকে আরেক রুমে আসলাম। প্রকৃতপক্ষে এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে। ফ্রেশ হয়ে এসব উদ্ভোট চিন্তা করতে করতে ঘুমাতে চলে গেলাম। 

পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে হোটেলে বুফে ব্রেকফাস্ট করতে গেলাম। ছিমছাম একটা হলরুম। বিভিন্ন দেশের মানুষ সকালের নাস্তা খেতে হাজির। আমি অমলেট আনতে গিয়ে এক বাংলাদেশি শেফের সাথে পরিচয় হলো। তিনি প্রায় বিশ বছর ধরে সুইজারল্যান্ডে পরিবার নিয়ে থাকেন। নিজ দেশের মানুষকে অন্য কোন মহাদেশে দেখে আমার বেশ ভালোই লাগলো। হোটেলে নাশতা পর্ব সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম জুরিখ শহর দেখতে। আমরা সুইজারল্যান্ড যাওয়ার আগে সুইসপাস বলতে একটা পাস কিনেছিলাম। এই পাস থাকলে সুইজারল্যান্ডে সকল গণপরিবহনে ফ্রি চলাচল করা যায়। সুইজারল্যান্ডের গণপরিবহন গুলোর মধ্যে সবথেকে আকর্ষনীয় লেগেছে ট্রাম। সব বড় রাস্তার ঠিক মাঝদিয়ে দুটো ট্রাম লাইন। একটি যাওয়ার আরেকটি আসার জন্য। প্রায় আধা কিলোমিটার পরপর ট্রামস্টপ। একই স্টপে কোথাও কোথাও বাসও থামে। ট্রাম এবং বাস দুটোই সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক। এগুলোর ছাদের উপরে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ সারা শহরের একরকম বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত। যেসব রাস্তাতে বাস কিংবা ট্রাম চলাচল করে, সেসব রাস্তাতে এই বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্কের দেখা মিলে। আমাদের হোটেলের অদূরে একটি ট্রামস্টপ ছিলো। আমরা প্রথমে ঠিক করলাম লেক জুরিখ দেখতে যাবো। গুগলম্যাপে দেখে নিলাম কিভাবে যাওয়া যাবে। প্রায় দশ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম ট্রামস্টপে। ট্রামে উঠে অনুভব করলাম পুরো ট্রাম ব্যাপারটা আসলে খুবই মজার। যেহেতু কিছুক্ষন পরপরই ট্রাম থামছে, কোন জায়গা দেখে ভালো লাগলে ট্রাম থেকে নেমে দেখতে যাওয়া যায়। এর পরে আবার কাজ শেষে অন্য আরেক ট্রামে চড়ে অন্য কোথাও যাওয়া যায়। ট্রামে চড়ে ঘুরাঘুরি যেন একটা খেলার মতো। ট্রাম থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম লেক জুরিখ। লেকের চারদিকে অপরূপ সুন্দর গাছপালা বেষ্টিত পাহাড়ি এলাকা। 

চলবে।